লেখক,
মাজারুল ইসলাম
মহাবিশ্বের মহান কারিগর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই পৃথিবীকে কত যে বৈচিত্র্যময় ও নিখুঁত তুলিতে সাজিয়েছেন, তা ঘরের কোণ থেকে বের না হলে কখনো উপলব্ধি করা যায় না। সম্প্রতি আমি এক দূর দেশে ভ্রমণকালে স্রষ্টার এক অপূর্ব ও বিস্ময়কর সৃষ্টির সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছিলাম।
সেখানে দিগন্তজুড়ে কেবলই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল পাহাড়। কোথাও সবুজ অরণ্যের চাদর, আবার কোথাও রুক্ষ অথচ তীব্র আকর্ষণীয় পাথুরে অবয়ব। সবচেয়ে বেশি তাজ্জব বনে গিয়েছিলাম, যখন দেখলাম, প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়ালে পাহাড়ের বিশাল বিশাল পাথরখণ্ড একটির ওপর আরেকটি টিকে থেকে উঁচু উঁচু শিলাস্তূপ বা রকমারি ভাস্কর্য তৈরি করে রেখেছে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যা-ই হোক না কেন, প্রথম দেখায় চোখ জুড়িয়ে যায়, আর মন গেয়ে ওঠে—‘তুমি কত সুন্দর, হে আমার সৃষ্টিকর্তা!’ কোন অদৃশ্য সুতোয় এই কোটি কোটি টন ওজনের পাথরগুলো ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে, তা ভেবেই কূল পাওয়া যায় না।
কিন্তু বিস্ময়ের শেষ এখানেই ছিল না। মানুষের জীবনশক্তি যে কত প্রবল, তা সেখানে না গেলে বুঝতে পারতাম না। পাহাড়ের এই আপাতকঠিন ও রুক্ষ পাথরের বুকেও মানুষ গড়ে তুলেছে তাদের সুখের নীড়। পাহাড়ের ঢালে ঢালে ছোট ছোট বাড়ি, বাগান ও ব্যবসাকেন্দ্র। ঘরের জানালা দিয়ে মেঘ ছুঁয়ে যাওয়া যায়। এই কঠিন পাথুরে পরিবেশেও মানুষের মনে বিন্দুমাত্র রুক্ষতা নেই। সেখানেও রয়েছে প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা আর মায়ায় জড়ানো এক মায়াবী জনপদের জীবনযাপন।
তারা পাথর কেটে তৈরি করেছে চোখজুড়ানো বিশাল উদ্যান। সেই রুক্ষ পাহাড়ের বুক চিরে যখন লাল, নীল ও হলুদ ফুলের মেলা বসে এবং সুউচ্চ সবুজ বৃক্ষরাজি হেসে ওঠে, তখন মনে হয়, যেন স্বর্গের এক টুকরো পৃথিবীতে নেমে এসেছে।
পাহাড়ের বুক চিরে ফোটা নানা জাতের ফুল, পাথরের মাঝে মানুষের ভালোবাসার স্পন্দন আর স্রষ্টার এই অদ্ভুত সৃষ্টিশৈলী আমার হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আমি স্তব্ধ হয়ে ভেবেছি, এমন মায়াময় পরিবেশের গোপন চাবিকাঠি কী? উত্তরটা কোনো বাহ্যিক ঐশ্বর্যের মধ্যে লুকিয়ে নেই; তা লুকিয়ে আছে মানুষের অন্তরের গহীনে। যখন একটি সুন্দর মন নিয়ে, কোনো স্বার্থ বা মলিনতা ছাড়া মানুষ কর্মযজ্ঞে লিপ্ত হয়, তখন তার হাতের প্রতিটি ছোঁয়া একেকটি নান্দনিক সৃষ্টিতে রূপ নেয়। সুন্দর চিন্তা হলো সেই বীজ, যা থেকে অঙ্কুরিত হয় সততার মহীরুহ, আর যার ছায়ায় জন্ম নেয় পরম সম্প্রীতি।
মহান আল্লাহ মানুষের জন্য এই পৃথিবীকে কত সুন্দর উপহারে সাজিয়ে দিয়েছেন! যিনি পাথরকে দিয়েছেন অটল স্থায়িত্ব, আবার সেই পাথরের বুকেই মানুষের জন্য দিয়েছেন জীবনধারণের কোমল রসদ—তিনি সত্যিই পরম দয়ালু ও শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী।
বুক চিরে কেবল একটাই শব্দ বেরিয়ে আসে—অশেষ কৃতজ্ঞতা।