মুক্তচিন্তা
একটি ভিডিওতে দেখলাম, মেয়েটি ছেলেটির পা ধরে কান্না করছে। পরে জানতে পারলাম, সন্তান না হওয়ায় সাত বছরের সংসারের ইতি টেনে স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়া হচ্ছে! ২০২৬ সালেও এমন ঘটনা ঘটে!
ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা এলাকায়।
একবার ভাবুন তো, আমরা কোন অন্ধকার যুগে বাস করছি? একটি মেয়ে দীর্ঘ সাতটি বছর একজন মানুষের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে সংসার করল। আর আজ তাকে একতরফাভাবে দোষী সাব্যস্ত করে ডিভোর্স দেওয়া হচ্ছে। কারণ কী? সে নাকি সন্তান জন্ম দিতে পারেনি!
বাহ! কী চমৎকার পুরুষতান্ত্রিক যুক্তি!
সবচেয়ে অবাক ও লজ্জার বিষয় কী জানেন? কোনো চিকিৎসা পরীক্ষা নেই, কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ নেই, কিছুই নেই! স্বামীর মনে হয়েছে, দোষ শুধু স্ত্রীর। আর অমনি কাজী ডেকে তালাকনামা প্রস্তুত!
বিজ্ঞান কি আপনাদের এলাকায় এখনো পৌঁছায়নি? নাকি এখনো সেই আদিম যুগের কুসংস্কারে পড়ে আছেন, যেখানে সন্তান না হওয়ার জন্য শুধু নারীকেই দায়ী করা হয়?
অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সন্তান না হওয়ার পেছনে নারী কিংবা পুরুষ—উভয়েরই শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। নিজের পরীক্ষা করানোর সাহস নেই, অথচ বিচার করতে নেমে গেছেন! এটা পুরুষত্ব নয় ভাই, এটা চরম দায়িত্বহীনতা।
সংসারটা কি আপনাদের কাছে সন্তান উৎপাদনের কোনো কারখানা? ভালোবাসা, সম্মান আর একসঙ্গে কাটানো সাতটি বছরের স্মৃতির কোনো মূল্যই কি নেই? সন্তান হয়নি বলে একজন নারীর জীবন এভাবে তছনছ করে দেওয়া কোনো সুস্থ ও মানবিক মানসিকতার পরিচয় হতে পারে না।
আচ্ছা, মানলাম—বাবা হওয়ার স্বপ্ন কার না থাকে? সন্তান সবারই কলিজার টুকরা। বংশের উত্তরাধিকারী চাওয়ার ইচ্ছা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণের জন্য সাত বছরের সাজানো সংসার এক মুহূর্তে ভেঙে ফেলা কোন ধরনের বর্বরতা?
সমস্যা তো থাকতেই পারে। যদি সত্যিই স্ত্রীর কোনো শারীরিক জটিলতা থাকে এবং চিকিৎসার পরও সন্তান ধারণ সম্ভব না হয়, তাহলে সমাধানের জন্য আরও মানবিক ও সম্মানজনক পথ খোঁজা যেত।
প্রথমত, ইসলাম ও বাংলাদেশের প্রচলিত আইন নির্দিষ্ট শর্ত ও বিধান সাপেক্ষে দ্বিতীয় বিয়ের সুযোগ দিয়েছে। যদি বাবা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রবল হয়, তাহলে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা যেত। তার অনুভূতি, অধিকার ও সম্মানকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। কিন্তু তা না করে একজন নারীকে সমাজের সামনে ‘বন্ধ্যা’ অপবাদ দিয়ে অপমানিত করা কেন?
দ্বিতীয়ত, পৃথিবীতে অসংখ্য এতিম শিশু রয়েছে, যাদের মাথার ওপর একটু ছাদ নেই, একটু ভালোবাসা নেই। আপনারা দুজনে আলোচনা করে কোনো শিশুর দায়িত্ব নিতে পারতেন। তবে দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আইন ও অভিভাবকত্বের বিধান মেনে চলার প্রয়োজন রয়েছে। একটি শিশুর জীবন ভালোবাসায় ভরে উঠত, আপনাদের জীবনেও আসতে পারত নতুন আনন্দ। রক্তের সম্পর্কই কি সব? ভালোবাসা, মমতা ও দায়িত্ববোধের মূল্যও তো কম নয়।
কিন্তু না! আমাদের সমাজের কিছু মানুষের অহংকার আর জেদ এতটাই প্রবল যে তাঁরা আলোচনা করতে চান না, মানবিক সমাধানও খুঁজতে চান না। তাঁদের কাছে যেন একটাই সহজ পথ—স্ত্রীকে ডিভোর্স দাও, নিজের দায় এড়িয়ে যাও, আর সমাজের সামনে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করো!
শুনুন, বাবা হওয়া জীবনের একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা হতে পারে। কিন্তু তার আগে একজন ভালো মানুষ, দায়িত্বশীল স্বামী এবং মানবিক জীবনসঙ্গী হওয়াটা আরও বড় পরিচয়।
একজন নারী শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার যন্ত্র নন। তাঁরও অনুভূতি আছে, আত্মসম্মান আছে, স্বপ্ন আছে, ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার আছে।
সন্তান না হওয়ার দায় একতরফাভাবে নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া বন্ধ হোক। চিকিৎসা, সচেতনতা ও মানবিকতার জয় হোক।