- ধর্ষিত বিবেক ও অন্ধকারের আবর্ত: আধুনিক সমাজে জাহিলিয়াতের পুনরুত্থান
রফিকুল ইসলাম
একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ লক্ষ্য করা গেলেও, মানুষের নৈতিক ও আত্মিক জগতের এক ভয়ানক দেউলিয়াত্ব উন্মোচিত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে আমরা সভ্যতার চরম শিখরে আরোহণ করছি, কিন্তু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ প্রবহমান এক কালান্তক বিষ। বাহ্যিক চটক আর অবকাঠামোগত উন্নয়নের আড়ালে মানুষের ভেতরের মনুষ্যত্ববোধ আজ পুরোপুরি ধূলিসাৎ। আধুনিকতার প্রদীপের নিচে এক চরম অন্ধকার গ্রাস করেছে আমাদের সমাজকে, যেখানে মানুষ তার আদিম ও হিংস্র রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় আমরা প্রাক-ইসলামী যুগের ‘আইয়ামে জাহিলিয়াত’ বা অন্ধকারের যুগের কথা পড়েছি, যেখানে জোর-যার-মুলুক-তার নীতিতে সমাজ পরিচালিত হতো। বর্তমান সমাজব্যবস্থার দিকে তাকালে মনে হয়, সেই বর্বর জাহিলিয়াতের যুগ যেন আরও ছদ্মবেশে, আরও ভয়ঙ্কর রূপে ফিরে এসেছে। আজকের দিনে মানুষের বিবেক ও নৈতিকতা এক ভস্মস্তূপে পরিণত হয়েছে। অন্যায়, অবিচার, খুন ও নির্যাতন এখন প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ তার ভেতরের পশুকে মুক্ত করে দিয়েছে, যার ফলে চারপাশের পরিবেশ আজ পশুর হিংস্রতাকেও হার মানাচ্ছে। পশুও যেখানে নিয়মের বাইরে শিকার করে না, মানুষ সেখানে স্রেফ আনন্দের জন্য কিংবা অহংকার প্রকাশের জন্য অন্য মানুষের জীবন কেড়ে নিতে দ্বিধাবোধ করছে না।
ক্ষমতার হানাহানি ও মসনদের নিষ্ঠুর খেলা:
এই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ক্ষমতার চিরন্তন ও নিষ্ঠুর হানাহানি। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে আজ চলছে এক আদিম আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। মসনদ আর গদির মোহে অন্ধ হয়ে মানুষ আজ ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। যে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব ছিল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেখানে ক্ষমতার দম্ভ আর রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি সাধারণ মানুষের জীবনকে পিষে ফেলছে। দলের স্বার্থ, গোষ্ঠীর স্বার্থ আর ব্যক্তিগত প্রতিপত্তির কাছে আজ আইনের শাসন জিম্মি। ক্ষমতার এই পঙ্কিল আবর্তে পড়ে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে নিরপরাধ মানুষ, আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি সেই অপরাধের পথকে আরও মসৃণ করছে। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন শোষিতের হাতিয়ার না হয়ে শোষকের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন ক্ষমতার এই হানাহানি সমাজকে এক অবক্ষয়ের শেষ প্রান্তে নিয়ে ঠেলে দেয়।
এই সামাজিক পচনের মূলে রয়েছে অর্থ ও ক্ষমতার প্রতি মানুষের সীমাহীন ও অন্ধ লোভ। বর্তমান যুগে মানুষের সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ব্যাংক ব্যালেন্স আর সামাজিক প্রতিপত্তি। এই মোহ মানুষকে এতটা অন্ধ করে দিয়েছে যে, দুর্নীতির বিষ আজ মানুষের রক্তে ও মজ্জায় মিশে গেছে। অন্যের হক নষ্ট করা, শ্রমিকের ঘাম ও রক্ত চুষে খাওয়া এবং সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করাকে এখন আর অপরাধ মনে করা হয় না; বরং একে অনেকে চাতুর্য বা সাফল্য বলে গণ্য করে। ক্ষমতার মদমত্ততায় মানুষ ভুলে গেছে তার নশ্বরতা। রক্তের কালির দাগে লিপ্ত হয়ে মানুষ গড়ে তুলছে নিজের মিথ্যার সাম্রাজ্য।
‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’—
এই মহান বাণী আজ কেবলই বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ। বাস্তবে আজ সমাজে মানবতা বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার জায়গা দখল করেছে তীব্র হিংসা, পরশ্রীকাতরতা আর নিষ্ঠুরতা। আর্তের চিৎকার আজ আর কারও হৃদয়কে স্পর্শ করে না, শোষিতের কান্না আজ শোষকের বিনোদনের খোরাক যোগায়। হৃদয় যখন নিজেই জমাটবদ্ধ পাথরে পরিণত হয়, তখন সমাজে কেবল হিংস্রতাই রাজত্ব করে। মানুষের এই চরম পতন ও একা হয়ে যাওয়া আজ পুরো সভ্যতাকে এক অন্ধকার কৃষ্ণগহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়া বিষ থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়, তবে তা অসম্ভবও নয়। এই তিমির রজনী কাটাতে হলে আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে মানবিক মূল্যবোধের শিকড়ে। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং মানুষের অন্তরের সুপ্ত বিবেক ও মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করা হওয়া উচিত। অর্থ ও ক্ষমতার মোহের ঊর্ধ্বে উঠে আইন ও সুশাসনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতার লোভ বর্জন করে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যতদিন না আমরা প্রত্যেকে নিজের ভেতরের এই জাহিলিয়াত ও হিংস্রতাকে দমন করে সত্য ও ন্যায়ের আলোকবর্তিকা হাতে তুলে নিচ্ছি, ততদিন সমাজকে এই কলুষতা থেকে মুক্ত করা যাবে না। বিবেকের অগ্নিশিখায় পুড়িয়ে দিতে হবে সব অন্যায়, তবেই আসবে এক নতুন, মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র ।
Leave a Reply