উপজেলা প্রতিনিধি(সিলেট)
সিলেটের ওসমানীনগরের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পথচলায় যুক্ত হয়েছে নতুন এক গৌরবময় অধ্যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও বৃহত্তর বালাগঞ্জ-ওসমানীনগরের কৃতিসন্তান জেনারেল এমএজি ওসমানীর পর দীর্ঘ ৫৪ বছর পর আবারও মন্ত্রিসভায় জায়গা পেল ওসমানীনগর। উপজেলার আরেক কৃতিসন্তান হুমায়ূন কবির প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে অসামান্য নেতৃত্ব দেওয়া জেনারেল এমএজি ওসমানী স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালে অবিভক্ত বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর এলাকা থেকে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। বৃহত্তর সিলেটের মানুষের পাশাপাশি ওসমানীনগরবাসীর কাছে তাঁর নাম গর্ব ও প্রেরণার প্রতীক।
এরপর কেটে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। দীর্ঘ এই সময়ে ওসমানীনগরের কোনো সন্তান আর মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার সুযোগ পাননি। অবশেষে ৫৪ বছর পর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল হুমায়ূন কবিরের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে। ফলে স্বাধীনতার পর দ্বিতীয়বারের মতো ওসমানীনগরের কোনো কৃতিসন্তান সরকারের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন।
হুমায়ূন কবিরের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ওসমানীনগরের বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে শুভেচ্ছা বার্তা দিতে থাকেন স্থানীয়রা। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সামাজিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও তাঁর নতুন দায়িত্বকে ওসমানীনগরের জন্য গর্বের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
গতকাল শনিবার (২২ আগস্ট) সন্ধ্যায় উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের বিভিন্ন বাজারে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আনন্দ মিছিল, পথসভা ও মিষ্টি বিতরণ করেন। বিভিন্ন বাজারে মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এ সময় স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বাজারের প্রধান সড়ক ও আশপাশের এলাকা।
মিছিল শেষে বিভিন্ন স্থানে সংক্ষিপ্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নেতাকর্মীরা সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও পথচারীদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেন। এসব কর্মসূচিকে ঘিরে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
হুমায়ূন কবিরের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে ওসমানীনগরবাসীর প্রত্যাশাও বেড়েছে। স্থানীয়দের আশা, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে তিনি ওসমানীনগরসহ সিলেট অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরবেন।
বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তাঁর কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা। ওসমানীনগরের বিভিন্ন উন্নয়ন চাহিদা সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরে বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবেন—এমন প্রত্যাশা তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কোনো এলাকার সন্তান রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হলে স্বাভাবিকভাবেই সেই এলাকার মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। হুমায়ূন কবিরের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এটি একই সঙ্গে তাঁর জন্য বড় দায়িত্বও। জাতীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজ এলাকার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোও তাঁর সামনে বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে উৎসবের আবহ
হুমায়ূন কবিরের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার খবরে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। উপজেলার আটটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পৃথকভাবে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ কর্মসূচি পালন করা হয়।
নেতাকর্মীরা বলেন, হুমায়ূন কবিরের প্রতিমন্ত্রী হওয়া শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য নয়, পুরো ওসমানীনগরবাসীর জন্য আনন্দ ও গর্বের বিষয়। একজন কৃতিসন্তান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসায় এখন এলাকার মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।
জেনারেল এমএজি ওসমানী ও হুমায়ূন কবির—দুই প্রজন্মের দুই কৃতিসন্তানের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পাওয়া ওসমানীনগরের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
১৯৭২ সালে জেনারেল এমএজি ওসমানীর মন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে অবিভক্ত বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর থেকে মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্বের যে অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, দীর্ঘ ৫৪ বছর পর হুমায়ূন কবিরের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই ইতিহাসে যুক্ত হলো নতুন অধ্যায়।
এ কারণে স্থানীয়দের কাছে হুমায়ূন কবিরের প্রতিমন্ত্রী হওয়া কেবল একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক অর্জন নয়; এটি ওসমানীনগরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত একটি ঘটনা।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর মন্ত্রিসভায় আবারও ওসমানীনগরের প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এখন পুরো উপজেলার মানুষের দৃষ্টি হুমায়ূন কবিরের নতুন দায়িত্ব পালনের দিকে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা—এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি ওসমানীনগরসহ সিলেটের মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
এমএজি ওসমানীর পর হুমায়ূন কবির—৫৪ বছর পর মন্ত্রিসভায় ওসমানীনগরের এই প্রত্যাবর্তন তাই একদিকে যেমন আনন্দ ও গর্বের, অন্যদিকে তেমনি নতুন প্রত্যাশারও সূচনা করেছে।

Leave a Reply