নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী'র মূলশ্রী গ্রামে প্রায় এক শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছেন একটি বিশেষ পেশাভিত্তিক জনগোষ্ঠী, যাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন চর্মকার বা মুচি—চামড়াজাত পণ্য তৈরির দক্ষ কারিগর। এক সময় সমাজে তাদের পেশার চাহিদা থাকলেও সময়ের পরিবর্তনে আজ সে পেশা হারিয়ে যেতে বসেছে।
‘চামার’ শব্দটি ঐতিহাসিকভাবে একটি জাতি বা সম্প্রদায়ের নাম হলেও বর্তমানে এটি সামাজিকভাবে অবমাননাকর শব্দ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের জন্য এই শব্দটি ব্যবহার অনেক সময়েই অসম্মানজনক। যদিও এ সম্প্রদায়ের অনেকেই বর্তমানে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে সমাজে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করছেন।
মূলশ্রী গ্রামের প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় একশ বছর আগে স্থানীয় অভিজাত সিকদার পরিবার তাদের পারিবারিক চামড়াজাত দ্রব্য তৈরির প্রয়োজন মেটাতে দুই ভাইকে অন্য অঞ্চল থেকে এখানে এনে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেন। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কাঙ্গালী’ ও ‘জঙ্গলী’ নামে ওই দুই ভাইয়ের বংশধররাই এখন এখানে চার প্রজন্ম ধরে বসবাস করছেন।
তবে এখন আর তারা আগের পেশায় নেই। যুগের পরিবর্তনে জীবিকার তাগিদে অধিকাংশই যুক্ত হয়েছেন আধুনিক সেলুন ব্যবসায়, কেউ বা অন্য পেশায়। তাদের অনেকে এখন নরসুন্দর, ক্ষৌরকর্মী, কেউ আবার দিনমজুর বা কৃষিকাজে নিয়োজিত। এদের মধ্য থেকে অনেকেই বর্তমানে আধুনিক জীবনযাত্রার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন।
বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে পাগলা, দিলীপ, সতীশ, রিপন, রাধু, সুবাস, ধীরে, দুলাল, সুশান্ত, প্রান্ত, প্রশান্ত, দিপু, দিপ রবিদাসসহ অনেকেই এখন নতুন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। যদিও পূর্বপুরুষদের চামড়ার কাজ প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে, তবুও তাদের ঐতিহাসিক অবদান আজও স্মরণীয়।
একসময় সমাজে জুতা তৈরির মতো চামড়াজাত পণ্যের জন্য চর্মকারদের ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি, শিল্পায়ন এবং প্লাস্টিক বা সিন্থেটিক উপাদানের বিস্তার সেই চাহিদাকে অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে, এই পেশা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।
মূলশ্রী গ্রামের এই ছোট্ট জনগোষ্ঠীর কাহিনি কেবল একটি পেশার পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং এটি একটি সমাজ-সংস্কৃতি ও সময়ের বিবর্তনের জীবন্ত দলিল।