কামরুল আলম
কবি চলে গেলেন আমাদেরকে ছেড়ে। এভাবে হুটহাট চলে যাবেন, ভাবিনি। এই তো গত রোববার, বইমেলায় পাপড়ির স্টলে এসে খোঁজ নিলেন। স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধি তাঁকে চিনতে পারেনি। পাপড়ি থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘ছড়ায় ছড়ায় পড়া’ বইটি স্টলে আছে কিনা দেখতে চাইলেন। পেছনে রাখা দেখে স্টলকর্মীকে বললেন, পেছনে ফেলে রাখলে বিক্রি হবে কীভাবে?
২০২৩ সালের কথা। বইমেলায় বরাবরের মতো আবেদন করেও স্টল পায়নি পাপড়ি। আবেদন করার সময় এক বিকেলে পল্টন মোড়ে চায়ের স্টলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ। সাথে ছিলেন টইটই প্রকাশনের কর্ণধার শাহেদ বিপ্লব। আমরা দুজনেই আবেদন করেও স্টল পাইনি। শাহেদ বিপ্লব ভাই ও আমাকে নিয়ে গেলেন তার বাসায়। পল্টন মেইনরোডেই তার বাসা। তার সম্পাদিত দৈনিক দেশজগত পত্রিকার অফিসও এখানেই। বসালেন, চা-নাস্তা, আড্ডার ফাঁকে বললেন, বইমেলায় আবেদন করেছেন, আশা করি স্টল পাবেন। পেয়ে গেলে তো ভালোই। না পেলে আমাকে জানাইয়েন। একটা ব্যবস্থা করে দেবো নে।
পাপড়ি এবং শাহেদ বিপ্লব-এর টইটই দুটো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানই স্টল পেল না। আমি তখন সিলেটে। শাহেদ বিপ্লব তো ঢাকারই বাসিন্দা। তাকে ফোন দিলাম। বললাম, নিজামী ভাইয়ের কাছে যাবেন নাকি, স্টল তো পেলাম না দুজনেই। তিনি বললেন, তার টইটইয়ের একটা ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এখন নিজামী ভাইয়ের কাছে গেলে উল্টে হিতে বিপরীত হতে পারে। আমি ফোন দিলাম, নিজামী ভাইকে। উনি বললেন, আপনি কোথায়?
জানালাম, সিলেটে। বললেন, দ্রুত ঢাকায় আসেন। পরদিন ভোরে তার বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। সকালের নাস্তা করালেন। তারপর বাংলা একাডেমির একজন ডাইরেক্টরের নাম বলে তার কাছে যেতে বললেন। কিছু প্রক্রিয়া জানিয়ে দিলেন। আমি দ্রুত একাডেমিতে গেলাম।
স্টল হচ্ছে হবে করেও হলো না।
প্রতিদিন সকালবিকাল খোঁজ নিতে থাকলেন মাহমুদুল হাসান নিজামী। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে সিলেটে চলে এলাম। তিনি আবার নাছোড়বান্দা হয়ে লেগে থাকলেন। বললেন, ও পারেনি তো কী হয়েছে? এবার আরেকজনকে ধরেছি। এবার কাজ হলো। পাপড়ি স্টল বরাদ্ধ পেল। ভাড়ার টাকা জমা দিয়ে ঢাকায় চলে গেলাম।
স্টল বরাদ্ধ দিয়েও নম্বর বুঝিয়ে দিল না বাংলা একাডেমি। নানা টালবাহানা করতে থাকল। আমি টানা ৮দিন ঢাকায় অবস্থান করলাম। প্রতিদিন মাহমুদুল হাসান নিজামী ভাই, আশ্বাস দিতে থাকলেন, এটা হবে। হয়ে যাবে। ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমি মোটামুটি হতাশ। তিনি তখনও আশ্বস্ত করতে থাকলেন, হবে। এটা হয়ে যাবে।
আমি একটি বিকল্প রাস্তার সন্ধান পেলাম। যুবলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এক ভাইয়ের বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনি বললেন, চিন্তা করবেন না, ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেন। নিজামাী ভাইকে জানালাম বিষয়টা। তিনি বললেন, আপনার এটা এমনিতেই হতো। তবু দেখা করে দেখেন।
দেখা করতে দেরি হল, স্টল পেতে দেরি হল না।
বইমেলায় স্টলকর্মীও পাইয়ে দিলেন মাহমুদুল হাসান নিজামী। বহু পরামর্শ দিলেন। অনেক স্টলে তার বই থাকলেও তিনি বইমেলার পুরোটা সময় পাপড়িতেই সময় দিলেন। ঢাকায় মাথার ওপর একটি ছায়া হয়ে দাঁড়ানো সেই মাহমুদুল হাসান নিজামী আর নেই, ভাবতেই কেমন যেন লাগছে। আল্লাহ তার ভুলত্রুটি, গুনাহগুলো মাফ করে জান্নাত নসিব করুন।