আফছানা খানম অথৈ
রাসেল মিমির সম্পর্কে চাচাতো ভাই। মিমির বাবা বড়, রাসেলের বাবা ছোট।মিমির দাদার মৃত্যুর পর দুভাই আলাদা হয়ে যায়।কিন্তু সম্পত্তি নিয়ে দুভাইয়ের মাঝে কথা কাটাকাটি হয়।মিমির বাবা নাকি বেশী সম্পদ ভোগ করছে,এটা রাসেলের বাবার অভিযোগ।এই নিয়ে অনেকবার বৈঠক হয়।কিন্তু কোন সমাধান হয়না। শুধু প্যাঁচ লাগে..।
আইন আদালত, মামলা, মোকদ্দমা যা করে সবখানে মিমির বাবা জিতে।
কিন্তু রাসেলের বাবা তা মানতে রাজী না।এই নিয়ে দু'পরিবারের মাঝে দন্ধ...।
শুধু যে দন্ধ তা নয়, দু'ফ্যামিলির মাঝে দা কুড়াল সম্পর্ক।পারলে একে অপরকে জ্যান্ত কবর দেয়।এমনি গোরতর অবস্থা।চাচাতো বোন মিমি অনার্স এ পড়ে,আর রাসেল বি বি এ।মিমি দেখতে শুনতে মন্দ না,খুব সুন্দরী,তা ও আবার একমাত্র মেয়ে। অনেক যুবক তার পেছনে ঘুরঘুর করছেকরে ।এবার তার উপর চোখ পড়ল চাচাতো ভাই রাসেলের। সে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। মিমি কিছুতেই রাজী হয়নি।কারণ তার বাবার সাথে তাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা।রাসেল যদি প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ভালোবাসার অভিনয় করে।এই ভয়ে সে তাকে ফিরিয়ে দেয়।একদিন রাসেল ছোট্ট একটা চিরকুটে কটা লাইন লিখে মিমির কাছে পাঠায়।
তাতে লেখা,
মিমি
সত্যি আমি তোকে ভালোবাসি।এ ভালোবাসা এক দিনের জন্য নয়, চিরদিনের জন্য।আমদের এ ভালোবাসা দু'ফ্যামিলির মাঝে মিলন ঘটাবে।এরপর ও যদি তুই আমাকে ভালো না বাসিস,তাহলে একশটা ঘুমের টেবলেট একসঙ্গে খেয়ে সুইসাইড করবো।আর ডায়েরীতে লিখে যাবো আমার মৃত্যুর জন্য তুই দায়ী।এবার ভেবে দেখ কি করবি?
ইতি
তোর চাচাতো ভাই
রাসেল।
মেয়েদের মন মোমের মতো নরম, একটা ছেলে মরতে বসেছে অমনি সেরেছে তার প্রতি দুর্বলতা বাড়তে থাকে।আজ মিমির ও সেইম অবস্থা।এত দন্ধ থাকা সত্বেও তার চাচাতো ভাই রাসেলের মরার কথা শুনে তার প্রতি মায়া বেড়ে গেল।তখনি সেও একটা চিরকুট লিখে পাঠালো।তাতে লেখা,
রাসেল ভাই,
আমাদের দুজনের ভালোবাসা যদি দু'ফ্যামিলির মিলন ঘটাতে পারে তাহলে তোমার আইডিয়াটা মন্দ না।আমি তোমার প্রস্তাবে রাজী।কাল বিকেলে পার্কে এসো।
ইতি
তোমার জেঠাতো বোন
মিমি।
পরদিন বিকেলে মিমি পার্কে গেল।রাসেল ও সেখানে উপস্থিত।দুজন যোগ হলো।একে অপরের মনের ভাব প্রকাশ করলো।রাসেল খুব করে মিমিকে ভালোবাসার কথা বললো।মিমি উত্তর দিলো,
রাসেল ভাই তুমি আমাকে ভালোবাস তা ঠিক।কিন্তু জেঠু যদি এ ভালোবাসা মেনে না নেয়।
মিমি তা নিয়ে তোকে টেনশন করতে হবে না,সে দায়িত্ব আমার। এখন বল,সত্যি সত্যি তুই আমাকে ভালোবাসিস কি না?
রাসেল ভাই মেয়েরা হচ্ছে সরল মনা।যাকে প্রথম ভালোবাসে তাকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসে।আর সেই ভালো সরল মনে যখন ছ্যাকা লাগে,
তখন তা সহ্য করতে না পেরে মেয়েরা সুইসাইড করে।আমার বেলায় ও তাই হবে।এবার ভেবে দেখো, তুমি কি সত্যি সত্যি আমাকে ভালোবাস, না পারিবারিক দন্ধের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ভালোবাসার নাটক সাজিয়েছ?
না মিমি , তা কখনো হতে পারে না।আমি এতটা বেঈমান না।আমাদের এ নাটক সত্যিকার ভালোবাসার নাটক।দু'ফ্যামিলির মিলনের নাটক।তুই আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারিস।
ওকে রাসেল ভাই যদি এটা সত্যি হয় তাহলে তোমাকে ভালোবাসতে আমার কোন দ্বিধা নেই।একটা কথা মনে রেখো যদি এর ব্যতিক্রম হয়, তাহলে হিতে বিপরীত হবে।
না মিমি সে ভুল আমি কখনো করবো না I love you. মিমি।
সত্যি?
হুম সত্যি।এবার তোমার মতামত বলো?
রাসেল ভাই Yes I love you too.
ওকে জান, এবার চলো বাসায় ফেরা যাক।
দুজনের ভালোবাসা পাকা করে তারা বাসায় ফিরে গেলো।এরপর থেকে দু'জনের প্রেমের লেনদেন নিয়মিত হয়।একে অপরের প্রেমে খুব করে মজে গেল।একে অপরকে এক পলক না দেখে কিন্তু থাকতে পারেনা।
রাসেল এমনভাবে তার সঙ্গে ভালোবাসা করে চলছে মিমির চোখে কখনো তার ভালোবাসার ছল ছাতুরী ধরা পড়েনি।মিমির পূর্ণ আস্থা রাসেলের উপর সে সত্যি তাকে ভালোবাসে।এ ভালোবাসায় নেই কোন খাদ।সেও রাসেলকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসে।ঐ যে বললাম মেয়েরা সরল মনা।যাকে ভালোবাসে তাকে সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়।মিমি ও ঠিক তাই করলো।একমাত্র রাসেল ছাড়া কাউকে আবেগের চোখ দিয়ে দেখেনি।এরফাঁকে কেটে গেল কয়েকমাস।একদিন মিমির বান্ধবী রিমি তার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে।পার্কে ঢুকতে একি!দেখল রাসেল এক মেয়েকে নিয়ে পার্কের বেঞ্চিতে বসে রোমান্স...।
রিমি আঁড়ালে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখল।তারপর মিমির কাছে প্রকাশ করলো।মিমি প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিলে ও পরে ঠিক মনের মধ্যে সন্দেহের দানা বেঁধে উঠল।সে রাসেলকে পরখ করার জন্য পার্কে ডেকে নিয়ে গেল।মিমি কিছু বলছে না।চুপচাপ মুখ ঘোমড়া করে বসে আছে।রাসেল তা লক্ষ্য করলো।তখনি প্রশ্ন জুড়ে দিলো,
মিমি তোর মন খারাপ?
মিমি চুপচাপ কিছু বলছে না।রাসেলের সন্দেহ হলো।সে আবার জানতে চাইল,
মিমি কিছু বলছিস না যে, কি হয়েছে তোর?
মিমি তাকে পরখ করার জন্য বানিয়ে বলল,
কি আর হবে, বিয়ের তোরজোড় চলছে।বাবা-মা দুজনে প্রস্তুত মেয়েকে পাত্রস্থ করার জন্য।
রাসেল চমকে উঠে বলে,
কি বলছিস মিমি, তো আমাদের ভালোবাসার কি হবে?
কি আর করবো, এখানে সমাপ্তি টানতে হবে।
বললেই হলো,আমি তোকে ছাড়া বাঁঁচবো না।আমি তোকে অনেক অনেক ভালোবাসি।
সত্যি?
হুম সত্যি।
তো চলো কাজী অফিসে।
কাজী অফিসে কেন?
বিয়ে করতে।
এক্ষণি।
হুম এক্ষণি। তাছাড়া দুদিন পরে হলে ওতো বিয়ে করতে হবে।বিয়ে যখন করবে তখন দেরী করে লাভ কি? তাছাড়া শুভ কাজ যত তাড়াতাড়ি করবে ততই মঙ্গল।
তা অবশ্যই ঠিক। মিমি আমি তোকে বিয়ে করবো একশ পার্সেন্ট সত্যি।তো সমস্যা হলো,সবেমাত্র পরীক্ষা শেষ হলো।আগে একটা চাকরী তারপর বিয়ে।জান, তোমাকে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।এই তোমার হাতে হাত রেখে বলছি আমি সত্যি তোকে ভালোবাসি।বাঁচতে হলে এক সঙ্গে বাঁচবো, মরতে হলে এক সঙ্গে মরবো।
মিমি আবারো রাসেলের ভালোবাসার কাছে পরাজিত হলো।তার মনের আকাশ থেকে সন্দেহের ঘোর কেটে গেল।সে রাসেলকে আরো বেশী বেশী ভালোবাসতে শুরু করলো।
তাদের ভালোবাসার কথা দু'ফ্যামিলির কেউ জানে না।এরফাঁকে কেটে গেল কিছু সময়। মিমির ছোট খালা বেড়াতে এসেছে তাদের বাসায়।তার এক ছেলে এক মেয়ে। বড় জনের বয়স সাত বছর, ছোট জনের বয়স চার বছর। তারা বায়না ধরেছে শিশু পার্ক ঘুরতে যাবে।কি আর করা মিমি ছোট খালা আর তার ছেলে মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে।তারা প্রতি বছর ছুটিতে মিমিদের বাসায় বেড়াতে আসে এমং দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে ঘুরে দেখে।তাছাড়া মিমির ছোট খালা একটু রোমান্টিক ও ভ্রমন বিলাসী।তাই সময় পেলে ছুটে আসে মিমিদের বাসায়।অমনি মিমিকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়।আজ ও অনুরুপ তাই করলো।তারা প্রথমে শিশু পার্ক গেল।কয়েকটা টিকেট নিয়ে ভিতরে গেল।প্রথমে বড় ছেলে রবিনকে ঘোড়ায় চড়ালো।তারপর মেয়ে তিন্নিকে লম্প ঝম্প খেলতে নিয়ে গেল। অন্য বাচ্চারা ও আছেন। সবাই একসঙ্গে লম্প ঝম্প খেলছে আর মজা করে হাসছে।বাইরে দাঁড়িয়ে রবিন মিমি তার মা হাত তালি দিয়ে তাদের সবাইকে উৎসাহ দিচ্ছে।তারপর সবাই মিলে ট্রেনে উঠল।নির্দিষ্ট সময় শেষ হতে তার ট্রেন থেকে নেমে পড়লো।এবার মিমির ছোট খালা বাচ্চাদের নিয়ে গেল খেলনা গাড়িতে চড়াতে।দুভাই বোন গাড়িতে চড়ে খুব মজা করছে।
গাড়িগুলো এমনভাবে ঘুরছে চোখের পলক যেন পড়ছে না।
কিন্তু মিমির চোখ হঠাৎ অন্যদিকে চলে গেল।মিমি দেখলো রাসেল একটা মেয়েকে নিয়ে খুব রোমান্স করছে।তাকে জড়িয়ে ধরে পিক তুলছে।তার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে কিস...।
নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্য মেয়ের সাথে রোমান্স করতে দেখলে কার মাথা ঠিক থাকে বলুন?মিমি আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না।ছোট খালাকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসলো।খালা জানতে চাইল,
মিমি কি হয়েছে, এমন করছিস কেন?জাদুঘরে ও গেলি না?
মিমি এক কথায় জবাব দিলো,
ছোট খালা আমার কিচ্ছু হয়নি।গাড়ির জার্নিং এ মাথাটা খুব ধরেছে।আমাকে ডিস্টার্ব না দিয়ে এখান থেকে চলে যাও।আমি ঘুমাবো।
মিমির অনুরোধে ছোট খালা ফিরে এলো।কিন্তু মিমির ভিতরে অসহ্য যন্ত্রণা বুক ফেটে যাচ্ছে তবুও কাউকে কিছু বলতে পারছে না।বিছানায় এপাশ ওপাশ গড়াগড়ি করছে।
ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি ও রাসেলের মতো নিষ্ঠুর হয়ে কোথায় পালিয়ে গেল।কোন মতে মিমির চোখে ধরা দিচ্ছে না।এক প্রকার নির্ঘুম রাত পার হলো মিমির।সকাল হতে সে উঠে পড়লো।ওয়াস রুমে ফ্রেস হতে ঢুকল,
তখনি মা আওয়াজ তুলল,
মিমি তাড়াতাড়ি নাস্তা খেতে আয়। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।
মিমি ফ্রেস হয়ে সবার সঙ্গে নাস্তার টেবিলে বসলো।মিমি নাস্তা খাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কেমন জানি আনমনা মনমরা।মা বুঝে মেয়ের মন।দৃশ্যটি মায়ের চোখে পড়তেই তিনি প্রশ্ন তুললেন,
মিমি তোকে এমন অস্থির অস্থির লাগছে কেন?কি হয়েছে?
তখনি ছোট খালা কথা শেয়ার করলো,
হ্যাঁ আপু ঠিক বলেছিস। গতকাল থেকে লক্ষ্য করছি তার মন খুব খারাপ। কিন্তু কেনো/এত করে জিজ্ঞেস করলাম সে কোনো কথার জবাব দিচ্ছে না।
তখনি মা আবেগমাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
মিমি তোর খালা যা বলেছে তা কি সত্যি? তুই আমাদের একমাত্র মেয়ে। তোর কিছু হলে আমরা বাঁচবো না।বল মা কি হয়েছে?
মিমি ম্লান হেসে জবাব দিলো,
মা আমার কিচ্ছু হয়নি।কলেজের দেরী হয়ে যাচ্ছে চললাম।বাই বাই বাই।