বুধবার , ১৩ মে ২০২৬ , সকাল ০৬:৪৯
ব্রেকিং নিউজ

গল্প:- চিৎকার

রিপোর্টার : নড়াইল জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ : শুক্রবার , ১৭ এপ্রিল ২০২৬ , বিকাল ০৩:০২

চিৎকার

আহমাদ কাউসার 

রূপালী থালার মতো সূর্যটা ঠিক মাথার ওপরে।পুরো দুপুর তখন।তেজোদ্দীপ্ত সূর্যের তাপে চারিদিক খা খা করছে।দক্ষিণের হাওয়ায় গাছের পাতা থরো থরো কাঁপছে।তবুও গরমে হাপাচ্ছে মানুষ ও প্রকৃতি।দিবাকর দত্ত ঘাসের বোঝাটা  মাথা থেকে নামিয়ে উঠানের বরই গাছের নিচে এসে বসলো।শরীর তার ক্লান্ত। ঘামে ভিজে গেছে পরণের লুঙ্গিটা।উঠানের দক্ষিণ দিকে বরই গাছটার ছায়া দক্ষিণের বাতাস এসে তার গায়ে লাগছে।ধীরে ধীরে শরীরে ঘাম শুকিয়ে গেল।তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো দীবাকর।হঠাৎ শুনতে পেল গুলির আওয়াজ। কিছু আঁচ করতে না পেরে উঠে দাঁড়ায় দিবাকর।কিছু বুঝার আগেই বাড়ি গিরে ফেলে মিলিটারিরা।এলোমেলো গুলি ছুঁড়ডে ছুঁড়তে ঢুকে পরে ঘরে।দিবাকরকে এসে বেঁধে ফেলে মিলিটারির সহযোগী জগলু।জগলু দিবাকর দত্তের প্রতিবেশী।ঘরের ভেতর ঠুস ঠুস আওয়াজ, মেরে ফেললো ওরা দিবাকর দত্তের বাবা-মা'কে।দিবাকরকে হেচরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে।আজই ভোরে মানুষ ঘুম থেকে উঠার আগেই গাঁয়ের মাদ্রাসায় ক্যাম্প গড়েছে আর্মিরা।এ খবর কেও জানে না।মাদ্রাসা মাঠে দিবাকরের মতে আরো কয়েক জনকে আগেই ধরে নিয়ে বেধে রেখেছে।দিবাকর দত্তকে  বাধা হয ক্যাম্পের ভেতর পুরণো তেতুল গাছটার সাথে।তেতুল গাছটা ক্যাম্পের কমান্ডারের রুমের ঠিক বরাবর।একটু পরেই টেনে হিচরে  আনা হয় জয়শ্রী দত্তকে।জয়শ্রী দিবাকর দত্তের প্রতিবেশী।ষোড়শী জয়শ্রী দেখতে যেন স্বর্গের অপ্সরাকেও হার মানায়।রূপে গুনে অতুলনীয়।গাঁয়ের সকলের স্নেহধন্য জয়শ্রী।আচার-আচরণে একদম মাটির মানুষ।ছোটরা শ্রদ্ধা করে।বড়রা স্নেহ করে।জয়শ্রীকে দেখে দিবাকরের মনটা দুমড়েমুচড়ে যায়।জয়শ্রী এক হলো তার প্রতিবেশী অন্য দিকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু অনির্বাণের প্রেমিকা।এটা গাঁয়ের কমবেশি সকলেই জানে।

দিবাকরের ভয় করছে পশুদের কথা ভেবে।সে শুনেছে যুবতীদের ওপর পাক হায়নাদের পাশবিক নির্যাতনের কথা। জয়শ্রীকে দিবাকরের সাথেই বাধা হয়।দিবাকর জয়শীর দিকে তাঁকায়।জয়শ্রী এতই ভয় পেয়েছে যে তার মুখ নীল হয়ে আছে।মুখে কথা নেই।নির্বাক।চুলগুলো এলোমেলো।কোন কথাই বলতে পারছেনা।প্রচন্ড ঠান্ডায় যেমন কাঁপে, তেমনি ঠোটগুলো কাঁপছে।তবুও দিবারক জয়শ্রীকে  জিজ্ঞেস করে,তোকে মেরেছে?

নির্বাক জয়শ্রী।স্হির দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে রইলো দিবাকরের দিকে।কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারেনি।ক্রমাগত ভূমিকম্পের মতো কাঁপছে ওষ্ঠদ্বয়। গাঁয়ে আতন্ক,ভয়,আর হতাশা বিরাজ করছে।কে কোথায় যাবে, কোথায় পালাবে------ এ নিয়ে ব্যাস্ত সবাই।জয়শ্রীকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবরটা শুনে----পাগলের মতো অর্নিবাণ দত্ত ছুটে গেলো ক্যাম্পে। অনিবার্ণ দত্ত জয়শ্রীকে ভালোবাসে।অনিবার্ণ ছাড়া আর কেউ সাহস করেনি ক্যাম্পে যেতে।সবাই আপন প্রাণ বাচাবার চেষ্টায় ব্যাস্ত।জয়শ্রীর বাবা-মা'কে গুলি করে খতম করেছে ওরা।অনিবার্ণ জীবন বাজি রেখে সোজা ক্যাম্পে ঢুকে পড়ে।ভালোবাসার শক্তি তাকে পিঁছু হটতে দেয়নি।ভালোবাসার অদম্য শক্তি তাকে একদম শত্রুুর ঘরে নিয়ে গেছে।।জয়শ্রীর ভালোবাস তার কাছে এমুহুর্তে সবচেয়ে দামি।অনির্বাণ জানে না সে ঢুকে পড়েছে এক ভয়ন্কর মৃত্যু  কুপে।যেখান থেকে বেঁচে ফেরার সম্ভবনা একদম নেই। কোনে লোক তাকে ক্যাম্পে যেতেও বারণ করেনি।ক্যাম্পে গেলে কি হতে পারে তাকে কেউ সর্তক করেনি।করবেই বা কি ভাবে? সকলেই আছে আতন্ক আর ভয়ে।অনিবার্ণকে দেখে আর্মি কমান্ডার জগলুকে জিজ্ঞেস করলো, কে এই ছেলে?

জগলু আমতা আমতা করে বললো,স্যার হে এই গাঁয়েরই ছেলে।অনির্বাণ দত্ত ওর নাম।

কেনো এসেছে এখানে?

স্যার এই ছেলেটা বেঁধে রাখা মেয়েটার প্রেমিক।আর যে ছেলেটা বেঁধে রাখা হয়েছে তার বন্ধু।

হে কি হিন্দু?

জ্বি,স্যার।

অনির্বাণ হিন্দু  এ কথাটা শুনামাত্রই এলোমেলো পেটাতে লাগলো তাকে।

তবুও অনির্বাণ হাত জোড় করে জগলুকে বললো,কাকা জয়শ্রীকে ছেড়ে দাও।প্রয়োজনে আমাকে মেরে ফেল।

জগলু তাচ্ছিল্যের সহিত বললো, আমি কিভাবে ছাড়বো।আর তুইতো নিজেই এখানে এসেছিস।জয়শ্রী কে ধরে এনেছে মিলিটারি ।মিলিটারির হুকুম ছাড়া আমি কিছুই করতে পারবো না।

রুম থেকে আরো দুজন মিলিটারি বেরিয়ে এসে অনির্বাণকে বন্ধুকের বাট দিয়ে পেটাতে লাগলো।জয়শ্রী ও দিবাকরের সাথে অনিবার্ণকেও বেঁধে ফেললো।

জয়শ্রী নিবার্ক। চুলগুলো এলোমেল।কথা বলতে পারছে না।অনির্বাণকে পিটিয়ে মিলিটারিরা যখন রুমে চলে গেল,তখন দিবাকর জিজ্ঞেস করে,তুই এখানে এলি কেনো?তুই বাহিরে থাকলে কিছু একটা করতে পারতি।এখানে তো তুই সিংহের মুখে পড়ে গেলি।

অনিবার্ণ কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো,।জয়শ্রীকে নিতে এসেছিলাম।

তুই ভূল করেছিস।এখন আমরা তিনজনকেই মরতে হবে।আমি ভাবছি জয়শ্রীর কথা। এই পশুরা যদি জয়শ্রীকে------

অনির্বাণ দিবাকরের কথা বুঝতে বাকি নেই।দিবাকরকে জিজ্ঞেস করে,এখন তাহলে কি করবো?

এখন কিছুই করার নেই।ভগবানের ওপর ভরসা রাখ।

অনির্বাণ জয়শ্রীর  দিকে তাঁকিয়ে  কাঁদতে লাগলো।জয়শ্রী নির্বাক তাকিয়ে রইলো অনির্বাণের দিকে।সবই বুঝতে পারছে জয়শ্রী,  কিন্তু কিছুই বলতে পারছেনা।কথা বলার শক্তি নেই এ মুহুর্তে তার।

রুম থেকে বেরিয়ে এলো বিশালদেহী এক মিলিটারি ।তিনি ক্যাম্প কমান্ডার।

কমান্ডার জগলুকে আদেশ করলেন,এই মেয়েকে রুমে নিয়ে এসো।

জগলু আর একটা আর্মি জয়শ্রীকে জোর করে টেনে নিয়ে গেলে রুমে।

অনির্বাণের বুঝতে বাকি নেই তারপর কি হবে।

চিৎকার করতে লাগলো জয়শ্রী ।

জগলুকে  অনুনয়ের সহিত অনির্বাণ বললো,কাকা,জয়শ্রী তোমার মেয়ের মতো ওকে ছেড়ে দাও।

দিবাকরও জগলুকে বললো,কাকা আমাদেরকে বেঁধে রেখে জয়শ্রী কে ছেড়ে দাও।

ওদের  কথায় মন গললো না জগলুর।

জয়শ্রীর  করুন চিৎকার ভেসে এলো।

অনির্বাণ তাঁকায় দিবাকরের  মুখের দিকে, দিবাকর তাকায় অনির্বাণের মুখের দিকে।

অসহায়ের মতো দুজন চিৎকার শুনেই যাচ্ছে। একেকটি চিৎকার এসে অনির্বাণের কলিজায় লাগে।সে নিরুপায়।

কমান্ডার বেরিয়ে এলো রুম থেকে।আর মুখে কিঞ্চিৎ হাসি।এ হাসিতে যেন লেগে আছে অসুরের ক্ষিপ্র থাবা। আরেকজন আর্মি দ্রুত রুমে ঢুকলো।আবারও জয়শ্রীর চিৎকার। অনির্বাণ আর কথা বলতে পারছে না।একদম নির্বাক।দিবাকর কান্না করছে।এভাবে একের পর এক আর্মি রুমে ঢুকে আর মুচকি হাসি দিয়ে বেরিয়ে আসে।আর জয়শ্রীর চিৎকার আর্তনাদ হয়ে ভেসে  আসে রুমের বাহিরে।আশেপাশে প্রকৃতিও যেন চিৎকারের করুণ শব্দে

বাক হারিয়ে ফেলেছে।প্রকৃতিও যেন সেদিন জয়শ্রী অনির্বাণের বিপক্ষে কাজ করেছে।এ চিৎকার  বাঁচার চিৎকার।এ চিৎকার অবলার করুন আর্তনাদ।ক্যাম্পের বাউন্ডারি পেরিয়ে এ চিৎকার সেদিন বাহিরে যেতে পারেনি।বাহিরে গেলেও কেউ শুনেনি।জয়শ্রীকে টেনে রুম থেকে বাহিরে নিয়ে এলো ক্যাম্পের সামনে খোলা মাঠে। তপ্তরোদে ফেলে রাখা হলো।জয়শ্রীর সাড়া শব্দ নেই।অনির্বাণ তাঁকিয়ে রইলো জয়শ্রীর নিথর দেহের দিকে।দিবাকরের কপোলে স্রোতস্বিনীর ঢেউ।

নিরুপায় ওরা।একটি তাজা প্রাণ। একটি ফুটন্ত প্রায় গোলাপ। প্রস্ফুটিত হবার আগেই ওরা মেরে ফেললো।

কমান্ডার এবার ধীরে ধীরে হেঁটে তেতুল গাছের কাছে এলো।জয়শ্রীকে  নিয়ে কুৎসিত  কথা বলতে লাগলো।

আর বাকি আর্মিরাও জয়শ্রীকে নিয়ে মজা করতে লাগলো।অনির্বাণের বুকে তখন আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত  আগুন।প্রতিহিংসার আগুন।তবু তার কিছু করার নেই।সে যে এখন বাঘের মুখে।শুধু শিকারের প্রতীক্ষায়।কখন তাকে গুলি করে ঠিক নেই।তার চোখ মুখ প্রতিশোধের লিপ্সায় লাল হয়ে আছে। কমান্ডার আর বাকি আর্মিদের ঠাট্টা মশকরা চলছেই।এর মাঝে অনির্বাণ  মেজাজ সংবরণ করতে না পেরে থুতু মারলো কমান্ডারের মুখে।সাথে সাথে শুরু হলো পেটানো।পেটাতে পেটাতে রক্তাক্ত করে ফেললো অনির্বাণকে।তবু ওরা ক্ষান্ত হয়নি।শেষে কমন্ডার তার হাতের রাইফেল দিয়ে গুলি করলো অনির্বাণের বুকে।অনির্বাণের বাঁধন খুলে দিলো জগলু।লুটিয়ে পড়লো অনির্বাণ  মাটিতে।দিবাকরকে প্রায় অচল করে ফেললো পিটিয়ে।দিবাকর দত্ত চিরতরে বাকশক্তি হারিয়ে ফেললো।সন্ধ্যায়  যখন পাখিরা নীড়ে ফেরে কিচিরমিচির করছিলো, তখনই দিবাকর তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুর রক্তাক্ত লাশ রেখেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়িডে ফিরে এলো।


 




গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিয়ম মেনে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত। কোড নং :- ৩৪৬১