কলমে- তাহ্ মিনা নিশা
নতুন নতুন কবিতা লেখা শুরু করেছে মৃন্ময়।সে ভূতত্ত্ব ও খণিবাদ্যার প্রথম বর্ষের ছাত্র।কবিতা সে আগে কখনোই লিখেনি। কিন্তু যেদিন থেকে সে মোহিনীকে আবিষ্কার করেছে, সেদিন থেকেই তাকে নিয়ে কবিতা লিখে যাচ্ছে।”আবিষ্কার করছে” এটা বলার কারণ হচ্ছে… মোহিনীকে তার হলের আর কেউ শোনেনি বা দেখেনি।শুধু মৃন্ময়ই তার অস্তিত্ব টের পেয়েছে।মোহিনীও বলেছে, মৃন্ময় ছাড়া আর কেউ তাকে কখনো কোনোদিন শেনেনি দেখেনি আর দেখতেও পারবে না।মৃন্ময়ের সাথে মোহিনীর পরিচয়টা হয়েছিল বড়ই অদ্ভুতভাবে।
একদিন মৃন্ময় ১২টার সময় ক্লাস শেষ করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের পুকুরে গোছলের জন্যে যায়।পুকুরের পানিও গরম হয়ে তে তে আছে।অতিরিক্ত গরমে জীবন যায় যায় অবস্থা। তাই মৃন্ময় ভাবে, পেয়ারা গাছের ছায়ায় খানিকক্ষণ বসে জিরিয়ে তারপর ঝাঁপ দেবে পুকুরে। পেয়ারার ডালে বসতেই মৃন্ময় লক্ষ করে কেমন যেন একটা মিষ্টি ঘ্রাণ তার নাকে পৌছেছে। সে মনে মনে প্রশ্ন করে,
— কোন পরিচিত ফুলের গন্ধ যেন এটা?
— ঠিক তখনি নারী কন্ঠে উত্তর আসে,
—শিউলি ফুলের
—হলের মধ্যে নারী কন্ঠ শুনে চমকে উঠে মৃন্ময়! ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক সেদিক তাকায়। তারপর মনে মনে বলে,
— মেয়ে মানুষ এখানে কোথা থেকে আসবে? ভুল শুনেছি আমি!
—ততক্ষণাৎ উত্তর আসে,
—তুমি মোটেও ভুল শোনোনি। আমিই কথা বলেছি।
— মৃন্ময় গাছের ডাল থেকে নামে পড়ে। মাটিতে নেমে শিরদারা শক্ত করে মূর্তীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর অনুসন্ধিৎসু মনে জানতে চায়,
— তুমি কে? তোমার নাম কি?
— আমি মোহিনী।
— মোহিনী! মানে কি?
— মোহিনী নামটি ক্রিয়া প্রকৃতি মোহ্ থেকে এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে ছলনা করা বা মোনমুগ্ধ করা। আক্ষরিক অর্থে একে বিভ্রমের মানবরূপকে বোঝায়। মধ্য ভারতের বৈগা সংস্কৃতিতে মোহিনী শব্দের অর্থ হচ্ছে "কামলালসাপূর্ণ যাদু"। এই নামটি "নারীর সৌন্দর্য ও আকর্ষণ এর ভাব" এরও অর্থ প্রকাশ করে।
— ওরে বাবা রে !!! হয়েছে,হয়েছে, থামো। এতো দেখছি পুরোই ডিকশনারি !! বুঝেছি তোমার নামের অর্থ। কিন্তু আমি তোমাকে দেখতে পারছি না কেন?
— আমাকে দেখা যায় না। আজ পর্যন্ত কেউ আমায় দেখেনি, কন্ঠও শোনেনি।আর দেখতে পারবেও না।
— তাহলে, আমি ব্যতিক্রম কেন?
— তুমি আষাঢ় মাসের ৬ তারিখে ঠিক দুপুর ১২টা ২৪ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে এইখানে এসেছো।এমন লগ্নে আর কেউ আসেনি। আর তুমি তুলারাশির জাতক। আমার কুন্ডুলীতে আছে, আমার যার সাথে প্রণয় হবে তার নাম মৃন্ময় হবে। তুমি আমায় আবিষ্কার করেছো। এখন থেকে আমি শুধু তোমার।
মৃন্ময় ভেতরে ভেতরে নার্ভাস ফিল করলেও মোহিনীর কন্ঠে কেমন যেন এতটা যাদুময়ী টান অনুভব করতে পারলো। অতি আগ্রহী হয়ে মনে মনে বাস্তবে এই অপ্সরীকে দেখবার আশায়,বুকে সাহস সঞ্চয় করে,দম নিয়ে, মৃন্ময় প্রশ্ন করলো,
— তোমাকে না দেখলে, স্পর্শ না করলে প্রণয় কি করে হবে?
— তুমি যদি আসছে মাঘী পূর্ণীমার রাতের আগেই ৯৬টা প্রেমের কবিতা আমায় উপহার দিতে পারো। তবেই আমাদের দেখা হবে।তবে শর্ত হচ্ছে…. কোনো কবিতা ১২ লাইনের কম ও ২৪ লাইনের বেশী হওয়া যাবে না। সব কবিতার শিরোনামে আমার নাম থাকতে হবে।
— আমি তো কবিতা লিখতে পারি না! তবুও চেষ্টা করবো। তোমার কথা কি আমার বন্ধুদের বলতে পারবো?
— বলতে পারো। তবে কেউ তোমাকে বিশ্বাস করবে না। তোমায় নিয়ে হাসাহাসি করবে। তারচেয়ে আমাদের দেখা হওয়ার পরে বলো। আর যখন আমাদের বিবাহ হবে তারপর সবাইকে দাওয়াত করে খাইয়ে দিও।
—তখন কি সবাই তোমাকে দেখতে পাবে?
— পাবে। আমি তখন কারো দেহে আশ্রয় নেবো। সবাই সেই দেহকেই দেখবে। আর তুমিই শুধু দেখবে আমার আসল রূপ। তোমার কি আমাকে বিশ্বাস হচ্ছে না?
— হচ্ছে, আবার হচ্ছে না! বুঝতে পারছিনা কি করবো! আমি অস্থির হয়ে আছি। তোমার উপস্থিতির একটা প্রমান পেলে মন শান্ত হতো।
— আচ্ছা। এই নাও…. বৃষ্টি…. শুধু তোমার জন্যে।
কাটফাটা রোদে হুট করে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি এলো। সেই বৃষ্টিতে ভিজে গেল মৃন্ময়। ভিজে জবজবে। পুকুরে আর নামবার প্রয়োজন পড়ল না। সে অনুভব করল মোহিনী হাসছে। আর হেসে হেসে বলছে,
— ঠান্ডা লেগে যাবে। মাথা মুছে নাও। বৃষ্টি থামিয়ে দিচ্ছি। তোমার ৪০৭ নম্বর রুমে যাও জলদি। লিখতে শুরু করো। খুব শীঘ্রই আমাদের দেখা হচ্ছে প্রিয়, মাঘী পূর্নীমার রাতে। ৯৬টা কবিতা লেখা হয়ে গেলে আমি তোমার জানালার পাশেই আসবো।
বৃষ্টি থেমে গেল। মোহিনীর কন্ঠ আর শোনা গেল না। কিন্তু মৃন্ময় সেদিনের পর থেকেই কবিতা লিখে যাচ্ছে। মাঘী পূর্নীমার আগেই তাকে ৯৬টা কবিতা লেখা শেষ করতে হবে।
মোহম্মদপুর, ঢাকা
৮ই জুন