লেখক :-
রেশম লতা
জারিফ তাবেয়ান। টাইলস মিস্ত্রীর সৈনিক ছেলে। আর্মিতে ১৪ বছর। বিশেষ জ্ঞানী। ইন্টেলিজেন্সিতে ছয় বছর কাটিয়েছে। বিশের বিষফোঁড়া আমার কইলজায়। সদর হাসপাতালে মারে দেখতে গিয়া তারে দেখলাম। শীতকালীন পোশাকে প্যাকেটজাত পুরুষ। জব্বর সুদর্শন। ভুইলা গেলাম আব্বারে কল দিতে। আব্বার আদরের বউ ৪০৫ নম্বর রুমে মাথায় চোট নিয়ে পইড়া আছে আর আমি মাইটা রঙা গাড়ির পিছে ছুটতাছি। ধুপকোলা মোড়ে আৎকা মনে পড়ছে। নানীরে ফোনাইলাম। একমাত্র জামাইরে কইতে মানে আমার আব্বারে তার বউ যে হসপিটাল নিছে। গত চল্লিশ মিনিট ভাড়া করা হোন্ডায় চড়তাছি। চোখ দুইটা সেই যে বুটের উপ্রে রাখছে আর উঠায় নাই। পয়লা ভাবছি ভদ্র ছেলে। পরে বুঝলাম বইসায় ঘুমাইতাছে। আমারে আর দেখে নাই। না দেখুক। তার ঘাঁটি আমি দেইখা আসছি। আমরা যে তাগো গাড়ির চল্লিশের ফলোয়ার সেটা বুঝাই নাই। তয় আমার সদ্য বৃদ্ধ হওয়া আব্বা ঠিকই বুচ্ছে আমি যে অন্য কামে ডুব দিছিলাম। রাতে মুখোমুখি। রোগী দেখার চেয়ে আর কি এমন জরুরী জিনিস দেখার বাকি ছিল? উত্তরে তার মতন নিজের পায়ের নীল স্যান্ডেলের দিকে তাকায়া আছিলাম। কয়েকটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস এমন ভাবে ছার্সি যাতে বুঝাইছি বিরাট বড় অপরাধ করছি। মাঝেমধ্যে ভাব ধরা আমারে বাঁচায়। কিন্তু তারে ছাড়া আমি বাঁচুম না এইটা আর কই নাই। দুইদিন পর আব্বার দেয়া সাইকেলটা নিয়া ভোঁ। ঘাঁটির পূবকোণায় স্ট্যান্ড দিয়ে সোজা তাবুর সামনে। এমন একটা ঘটনা ঘটাইলাম যাতে ছোটখাটো একটা শোরগোল পড়ে গেল। না না আহামরি কিছু মিছা কই নাই, শুধু বলেছি আমার স্নেকটাকে খুঁজে পাচ্ছিনা সম্ভবত তাবুর আশেপাশেই আছে। সমস্ত সৈন্যরা আমার কথা বিশ্বাস না করে পারে নাই। কেননা তখন হাতে একটা হোয়াইট রেবিট আছিল। ওর নাম সিয়া। আমার পোষ্য। ওরে জাউস সাগরের পাড়ে সিলছি বনের গভীরের ঝোপ থেকে কুড়িয়ে এনেছিলাম। তখন আমার বাইশ বসন্ত। পৌষ অবকাশের বেড়ানোতে আব্বা-আম্মা, আমি আর দাদু খুব ক্রিকেট খেলছিলাম। আমার বলে আব্বার ডবল ওভার ছক্কায় সিলছিতে বল হারায়। আব্বার'চে দাদু নিষেধ দিছিল বেশি। তাও গেছি। সিয়া পথ হারিয়ে আমার সামনে। বন থেকে ফিরার সময় বানরে আটকায়ছিল। মনে আছে। হেশে আব্বা বাঁচায়ছিল। যাউগ্গে, চারিদিকে খোঁজাখুঁজির ধুমধাম। হঠাৎ কেউ একজন বলল, আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি। কথা ঘুরানোর জন্য বললাম আগে বলুন স্নেকটাকে পেয়েছেন কিনা! না, দেখছি। সিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে দিলাম। সোজা সে সাইকেলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আমি ওকে ধরার বাহানা করে জোরে হেঁটে হেঁটে বলতে লাগলাম বাসায় যাবা - বাসায় যাবা? অতঃপর বাঁচা গেল! বাসায় এসে মনে পড়লো লোকটা যে ড্রাইভার ছিল।
এরপর সপ্তাহ দুয়েকের শনিবার বিকেলে আমার ভীষণ প্রেম পেল। ওদের তখনও মহড়া চলছে। সকালে বাড়ির পুকুর সেচায় চারটে ডোরা সাপ ধরা পড়ে। একটা নিয়ে মহড়া স্পটে গেলাম। কর্ণেল সোজাউদ্দিন আমার চোখ পড়েই বুঝেছেন আমার যে তিনটে হাত। বাড়তিটা প্রেমাজুহাত। আমাকে নিরাপদ দূরত্বে পাঠিয়ে জারিফ তাবেয়ানকে ছেড়ে দিলেন। এতটা কাছে এত অল্প সময়ে আসা যে তা এই প্রথম অনুধাবন করলাম।
আমি যা বলতে চাচ্ছি সেও যেন তাই। আমি তো বলেই দিছি মাগার সে কয় নাই। না কওক। সাপটা দেখায়া যখন আমারে কামড় দিছে বইলা নাটক করলাম তখন তার আমার পা চুষে বিষ ফেলার কান্ড দেখেই নিশ্চিত হইছি।
এর কয়েক মাস পর যখন গ্রীষ্মের সকাল জারিফ আমাদের উঠানে। ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ। নাইয়র আসা দুঃসম্পর্কের আত্মীয়রাসহ আমরা বেবাকতে অবাক। তাবেয়ান যেন পুরা তালেবানি কায়দায় আমাগোরে অ্যাটাক করছে মনে হচ্ছে। একদম ইমোশনাল জেড টি ফোর্স। এ ফোর্সের একজনই মেজর, একজনই অধিনায়ক, একজনই সৈন্য আর ওই একজন সে নিজেই। যুদ্ধের ময়দান। আমাকে পুরোটাই হালাল কইরা পাওয়ার জন্য আব্বার কেদারার পাশে থাকা ছোট্ট পিঁড়িতে হাঁটু উপচায়া পজিশন নিছে। আব্বায় তখন মাথায় টুপিসমেত হাতে তজবি লইয়া কি সব বেইন্নার আমলনামা আওড়াইতাছে। আব্বার পা'দুটো ধরে অনর্গল নায়কোচিত ডায়ালগ। আমি আর দাদু মুখে গামছা চাইপা হাসতাছি। দাদুর একটা কথা মনে ধরছে, পিরিতি কাঁঠালের আঠা লাগলে পরে ছাড়ে না। আমার মনে ভুট্টার খই। মানুষ অতিরিক্ত আনন্দে নিজের অবস্থানবোধ শিথিল করে নেয় মানে হয়ে যায়। ক্ষণিকের জন্য হলেও স্বর্গবাসি মনে করে। হাওয়াই উড়া প্রজাপতি কিংবা ইউরোপিয়ান এমিলি ফ্লাওয়ার। আমার চোখ সদ্য বিলিন হতে যাওয়া রাতের সাদা চাঁদটার দিকে। আমি ক্রমশ মুন্ডার মতো গলে যাচ্ছি। উত্তর পাড়ার ভাবীগোর চিমটি মাইরা অট্টহাসি আমারে চেতনা ভাড়া দেয়। জাগনা অই। এ আমি কি দেখছি। জারিফ জব্বর খেল দেখাইছে। অথচ কখনো মুখে বলেনি ভালোবাসি। কেবল একটা আকস্মিক চুম্মা দিছিল।
সিনেমার মত ওর হাত ধইরে মাইটা রঙা গাড়িতে উঠলাম লগে দাদু, বড়মামা, নিমুকাকী, বলাইদা আর মেসাব। বিয়া অই নাই। তয় মন খালি কবুল কবুল করতাছে। কয়েক ঘন্টা পর কাঙ্খিত সময়। তাগো বাড়িতে ঢুকতেই বিরাট ফটক। ঝিমধরা পরিবেশ। একটা বছর পাঁচেক বাচ্চার টানা কান্নার আওয়াজ। এটাকে বিয়ে আমি ক্যামনে কমু? সুরেলা কন্ঠে গৃহবধূর স্বামীহারা আর্তনাদ। ওহ্ এটাকে বিয়ে বাড়ি বলে?
সবাই সবার দিকে চায়া আছে। আমি তাবেয়ানের দিকে। ঘরের ভেতরে ঢুকতেই ছ'মাসের গর্ভবতী তার উপ্রে ঝাঁপায়া পড়ছে। এ তুমি করতে পারো না! এ তুমি পারো না! আর এদিকে আসমান ভাইঙা আমার কবুল কওয়া দমের উপ্রে পড়ছে। বুঝাইতাছিল এ গৃহলক্ষ্মী তার মৃতভাইয়ের আমানত। ঘটনা সত্য। তয় আমারে তারা ছ'মাসের হিস্যা দিবার পারে নাই।
একটা প্যারাপ্লেজিক মন লইয়া বইয়ের পাতা খুললাম।
নিজেকে আহাম্মক সাব্যস্ত করে উত্তেজিত মনের উত্তেজনা ভাঙ্গানোর জন্য প্রথমে ভাবলাম একটা লালপাথর বা অন্য কিছু ওগো টিনের চালে নিক্ষেপ করা উচিত। কিংবা মন্তব্য বিভাগে লৌড় দেওনের আগে প্রেমটাকে ঝুকে বলি শালা বাঞ্চোত।
অনবরত শিশিরের শব্দ গণনা করছি। মনে হচ্ছে ছ'মাসের অভূমিষ্ট শিশুটার একটা সাধারণ জ্ঞান আমাকে স্পষ্টভাবে প্রেমের গভীরতার পরীক্ষা নিচ্ছে। আমি বিমূর্ষ হই, ভয় পাই_ তুমুল ভাবে ভেঙে পড়ি। জিহ্বার চামড়া উল্টায়া বলতে লাগি, কি এক পাতিলপুড়া দিন আইলো আমার। মিনাল তুমি আইলা না। ন্যাংটা কালের। ওরে দেইখাই প্রেমটা শিখছিলাম।
অথচ পার্থক্যটা আছিল এই