বুধবার , ১৩ মে ২০২৬ , রাত ১২:১৯
ব্রেকিং নিউজ

গল্প-মনের প্রতিবন্ধকতা

রিপোর্টার : কবি রুহুল আমিন
প্রকাশ : রবিবার , ৭ জুলাই ২০২৪ , দুপুর ০২:১৯

লেখক :- তাহ্ মিনা নিশা

আমি কুহু। আমরা দুইবোন, এক ভাই। বোন সবার বড়, তার নাম কেকা। তারপর ভাই, ভাইয়ের নাম কন্ঠ। আর সবচেয়ে ছোট আমি। আমাদের নামগুলো সবই শব্দের সাথে যুক্ত তাই না?  যেই ধ্বনি কানে শোনা যায়। আমাদের এই নামগুলো রেখেছে আমাদের বধির বাবা। হুম, ঠিকই বলেছি। আমাদের বাবা ছিলেন একজন বধির, মানে তিনি কানে শুনতেন না। জন্মগত ভাবেই তিনি বধির ছিলেন।

          বড়লোকের একমাত্র সন্তান বধির হলেও কপালে সুন্দরী বৌ জুটে। তার প্রমান আমাদের মা। মধ্যবিত্ত ঘরের অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন আমার মা। আমার নানার, তার সাত কন্যা সন্তানের ভার মাথা থেকে নামাতে তার পাঁচ নম্বর মেয়েটিকে বড়লোকের বধির ছেলের কাছে পাত্রস্থ করেছিল। প্রথম দিকে মা খুব কষ্ট পেলেও আস্তে আস্তে বধির স্বামীর প্রেমে পড়ে যায়। তার ফলস্বরুপ আমাদের তিন ভাইবোনের জন্ম। 

           বাবা ভয়ে ভয়ে থাকতো ও মনে করতো তার সন্তানেরাও বোধহয় তারই মতো কানে শুনবে না। কিন্ত আমরা সবাই মায়ের মতো স্বাভাবিক হয়েছি। এতে বাবা খুব প্রশান্তি অনুভব করতো। তাই তো আমাদের নাম রেখেছেন….কেকা, কন্ঠ, কুহু। বাবা,মা ও আমরা তিনজন মিলে ছিল সুখী সংসার।  

           কেকা আপার পড়াশুনা শেষ হলে তাকে  সম্রান্ত এক পরিবারে বিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সেই পরিবারে গিয়ে কেকা আপা সুখী হতে পারে না। মাঝে মধ্যেই ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকতো দুলাভাইয়ের সাথে। প্রায়ই আপা রাগ করে বাবার বাসায় চলে আসতো। মা আবার দুইদিন পর বুঝিয়ে সুঝিয়ে  দুলাভাইয়ের বাসায় পাঠাতো। কিন্তু বেশীদিন থাকতে পারতো না। আবার শরীরে নানা রকম অত্যাচারের দাগ নিয়ে ফিরে আসতো কেকা আপা।  শরীরের ব্যথা কমার আগেই হয়তো দুলাভাই নিতে আসতো আপাকে। আপাও দুলাভাইকে দেখে সব ভুলে যেতো। মাফ করে দিতো তাকে। ব্যাগ বোচকা নিয়ে আবারো রওনা হতো দুলাভাইয়ের সাথে। এমনি একদিন খবর আসলো কেকা আপা সুইসাইড করেছে। 

       মা কেকা আপার চলে যাওয়া মেনে নিতে পারলো না। আপার মৃত্যুর সংবাদ শুনে সেই যে বিছানা নিলো, আর উঠলো না। কেকা আপার মৃত্যুর দুই মাস পরে মাও পৃথিবী থেকে বিদায় নিল। বাবা, ভাইয়া ও আমি মিলে আমাদের সংসার মোটামুটি চলছিল। মা মারা যাওয়ার এক বছরের মাথায় বাবার এক বন্ধুর মেয়ের সাথে হঠাৎ করে কোনো অনুষ্ঠান ছাড়াই ভাইয়ার বিয়ে দিয়ে দিলো বাবা। 


             ভাবী আমার বয়সী, তাই তার সাথে বন্ধুত্ব করতে বেশী সময় লাগলো না আমার। আমরা ভাবী ননদ মিলে সংসারের যাবতীয় কাজ করতাম আর পড়াশুনা করতাম। ভালোই সময় কাটছিল আমাদের। ইতিমধ্যে ভাবী অন্তঃসত্বা  হলো। তাই তার পড়ালেখায় ভাটা পড়লো।আমাদের ঘরে একটা ফুটফুটে মায়ের জন্ম হলো। আমার ভাস্তির মুখের আদল যেন ঠিক আমাদের মায়ের মতো। আমাদের সংসার কানায় কানায় পরিপূর্ণতা  পেল।

        এদিকে বাবা আমার বিয়ে ঠিক করলেন তারই মতো একজন বধির পাত্রের সঙ্গে। আমি একজন বধির পিতার সন্তান। আমি দেখেছি আমার বাবাকে, কতটা সাহসী সংগ্রামী ও বিচক্ষণ মানুষ তিনি। তাই বাবার সিদ্ধান্তে আমার ভাবী ও ভাইয়ার আপত্তি থাকলেও আমার কোনো আপত্তি ছিল না। কেনই বা থাকবে? কেকা আপাকে তো সুস্থ স্বাভাবিক একজন মানুষের সাথেই বিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরিনতি কি হলো… সেটা তো সবাই জানেই। তাই আমি খুশী খুশী ভাবেই বিয়ে করে অন্যের বাড়ীর বধির পুত্রের বউ হয়ে চলে গেলাম।

            আমার বিয়ের একমাস পরে আমাদের জন্মদাতা বধির পিতার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর শোক ভুলতে না ভুলতেই আমার পক্ষাঘাত গ্রস্থ শাশুড়ী মারা যান। শাশুড়ীর মৃত্যুকে আমার শ্বশুর মেনে নিতে পারেন না তিনিও তিনদিনের মাথায় দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। আমার বিয়ের চার মাসের মধ্যেই মুরব্বীদের এমন মৃত্যুর মিছিল, নতুন বৌ হিসাবে আমাকে শ্বশুরবাড়ীর লোকের সামনে অপয়া প্রমানের যথেষ্ট ইঙ্গিত দেয়। আমি যেন পড়ে যাই মহা বিপদে। আত্মীয় স্বজনের কানাঘুষায় আমার কান পঁচে যাওয়ার অবস্থা। 

           আমার স্বামী আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। সে সব কিছু ভুলে গিয়ে বাবার ব্যবসার  দিকে আমাকে মনোনিবেশ করতে পরামর্শ দেয়। আমার শ্বশুরের প্যাকেজিং এর ব্যবসা ছিল। বিদেশ থেকে গাড়ীর পাটস্ আসতো বাংলাদেশে । সেগুলোকে এ্যাসিম্বল করে বিদেশে পাঠানো হতো। এই কাজগুলোর তদারকী আমার শ্বশুর বাবা করতেন। আমার স্বামী চায়, এখন আমি আমার শ্বশুর বাবার জায়গায় কাজ করি। সমস্ত বায়ারদের সাথে আমিই যেন কথা বলি, মিটিং করি ও টেন্ডার দিয়ে কাজ হাতে নেই। এদিকে আমি তো ব্যবসার কিছুই বুঝি না। কিভাবে কি করবো মাথায়ও আসছে না। আল্লাহের উপর ভরসা করে এই বিষয়ে কিছু ট্রেনিং নেই। তারপর কোমর বেঁধে কাজে লেগে পড়ি।

        বর্তমানে আমার স্বামী প্যাকেজিং এর মডিফাই করে নিজের আটিষ্টিক সত্বা দিয়ে। আর আমি অফিস চালাই। বিভিন্ন বিদেশী ডেলিগেটসদের সাথে কথা বলে, মিটিং করে কাজ পাই। বিদেশীরা আমাদের কাজের ফিনিশিং দেখে বেশ সন্তুষ্ট।দুটো কারখানার থেকে এখন আমাদের চারটা কারখানা হয়েছে। অবশ্য এরই মধ্যে কেটে গিয়েছে দশটি বছর। আমাদের ঘরে একটি সুস্থ ছেলে সন্তানের জন্ম হয়েছে।যে স্কুলে পড়ে এবং আমার বাবার মতোই বেশ মেধাবী ও বিচক্ষণ।  


           আমার বাবা ও স্বামী দুজনই প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে  নিজেদের বিচক্ষণতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সমাজে ও সংসারে নীতিবান, দায়িত্বশীল ও আদর্শ পুরুষ হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। আসল প্রতিবন্ধকতা মানুষের শরীরে নয়, মনে। কেকা আপার স্বামী, মানে আমাদের দুলাভাই ই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। যেই স্বামী তার স্ত্রীর মর্যাদা দেয় না, তার মূল্যায়ন করেনা সে আর যায় হোক, কখনোই  সুস্থ মানসিকতার মানুষ হতে পারে না। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত নিজের মানসিকতাকে উন্নত করে একটি সুস্থ সংসার, সমাজ তথা দেশকে সুন্দর ও সফল করে গড়ে তোলার প্রচেষ্ট করা।


১লা জুলাই

মোহম্মদপুর, ঢাকা

 




গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিয়ম মেনে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত। কোড নং :- ৩৪৬১