লেখিকা :- জেবুন্নেছা জেবু
সাগর ময়নার দিকে তাকিয়ে আছে, ময়না বললো বাসায় যাও । সাগর বললো ময়না তুমি কেনো অন্যদের মতো হতে পারো না? কেনো আগের মতো বলো না আমি তোমাকে ভালোবাসি । এই কথাটা কেনো বলতে পারো না? কেনো বলো না তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না, আমাকে তোমার করে নাও। যেমনটা আগে বলতে ! ময়না হাসতে হাসতে বললো, তুমি একটা পাগল। আগের তুমি এখনের তুমিতে অনেক তফাৎ। এখনের সাগর অনেক ভারী যার ওজন বহনের ক্ষমতা আমার নাই।
সাগর তার উচ্ছসিত হাসিতে হারিয়ে যায় , মনে হয় সব সুখ ময়নার কাছে। কিসের জন্যে ময়নাকে ছেড়ে আমি পিউকেই জীবনে জড়ালাম, যাকে কোনোদিন ভালোইবাসিনি । ময়নার সাথে কথা বলা তার হাসি তাকানো,সব সাগরকে অদ্ভুত ভাবে মোহিতো করে যা পৃথিবীর আর কোনো নারীর সাথে ঘটে না। হয়তো এর নাম ভালোবাসা।
ময়না বললো-
পথ অতিক্রম করতে হলে তোমার এক পা সামনে আরেক পা পেছনে যায়, সামনে যেতে হলে একটাকে পেছনে ফেলেই এগিয়ে যেতে হয় ।সমান ভাবে লাফানো যায় পথ চলা যায় না আগে পিছে ভাবতে হয় ।
সাগর বললো,
তাইতো আজকের অনুভব আগামীকাল বদলে যায়, শপথের মালা ছিড়ে যায় । তবে বর্তমান ঠিক রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ , প্রকৃতি মূহুর্ত্তেই পাল্টে দিতে পারে সব পরিকল্পনা।
ময়না বললো এখন বলো তোমার সামনের পরিকল্পনা কি বলো?
ময়না আমি কখনোই কাউকে নিজের পরিকল্পনা বলি না কেনো জানো?
বলো কেনো?
একটু পর আমাদের সাথে কি ঘটবে তা কিন্তু মোটেও কেউ জানি না, আমরা যখন নিজেদের পরিকল্পনা বলি আমার মনে হয় উপরওয়ালা সেটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছুড়ে দেন, তিনি যেনো বলেন- তুই কে পরিকল্পনা করার ,আমিই তোকে সৃষ্টি করেছি আমিই নিধার্রন করবো কবে কি হবে।
হুমম , তা তুমি ঠিক বলেছো।
আচ্ছা চলো তোমাকে বাসায় নামিয়ে দেই যেতে যেতে সাগর ভাবে --জীবনের চাওয়া পাওয়ার সাথে বাস্তবতার যে সংঘাত সেখানটায় দাড়িঁয়ে কেউ কখনো কোন নিয়মের সংজ্ঞা দিয়ে জীবনকে চালাতে পারে না। দুনিয়া জুড়ে বেচেঁ থাকার কঠিন যুদ্ধে আমরা কেউ হারতে চাই না,
জীবনটা পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেলে ও বাহিরে মিথ্যা হাসিটা বজায় রাখতে হয় বলা যায় না আমরা ভালো নেই, মরে যাচ্ছি একটু বাচঁতে চাই, একটু করুনা চাই।
অথচ কেউ কাউকে একটু হাসাতে চায় না, কাদাঁতেই যেনো সকল তৃপ্তি
জীবনের দ্বৈত নীতিগুলোর কাছে আমরা বড় বেশী অসহায় পরাজিত, শুধুমাত্র আমার আমার করি আমরা, আমাদের ভাবতে পারি না, সুখী হতে পারি না মনের সংকীর্ণতায় ,আর এটার জন্যই এতো দৈন্যতা এতো অসুখ ।
আমি জানি,
পরকীয়া ঠিক সিগারেটের মতোই তবুও সাজানো সংসার ছেড়ে আমরা আগুনে পুড়ে মরি। ভাবতে চাই না নিজ সংসার ব্যতীত অন্য কোথা ও সুখ নেই , তবুও অতৃপ্ত হৃদয় নিয়ে আমরা মনের মতো ভালোবাসা খুঁজি। ভালোবাসাহীন জীবন যে আহত পাখির মতন।
আমার স্ত্রী পিউ আমাকে কখনো বুঝতেই চায়না, সে তার নিজের ইচ্ছেকেই প্রাধান্য দেয় সব বিষয়ে।
পিউকে অনেকবার বলেছি
তোমাকে ভালোবেসেছি বলে ভেবো না তোমার সব অন্যায়কে প্রশ্রয় আশ্রয় দেবো,সে তুমি যেই হও না কেনো।
তোমার শত বাহানা সেখানে তুচ্ছ, কোন বিষয়ে উপরের নম্রতা মানেই ভেতরে কঠিন অবস্থান ভেবে নিও।
ঠিক নরম মাড়ি হতে শক্তিশালী কঠিন দাঁত উঠার মতন।
তাকে যতই বুঝিয়েছি সে তার নিজের টাই বুঝেছে
খাঁটি যদি না হয় শস্যদানা
বৃথাই আশা উত্তম ফসল
নকল বীজ মৃত্তিকায় বপনে
অকারণে ঢালি জল,
মিছে প্রেমে পুড়িয়ে সময়
অন্তর করি ক্ষয়,
বোকা মন ভালোবেসে
তবুও মানে পরাজয়।
পিউকে কতো উদাহরণ দিয়েছি বলেছি
আমরা বিশ হাজার টাকা বেতনের চাকরির জন্য বিশ বছর রাতদিন পড়াশুনা করতে পারি কিন্তু নিজেদের মঙ্গলে অনন্ত কালের জন্য পাঁচ মিনিট মহান স্রষ্টাকে ডাকতে অনিহা প্রকাশ করি। স্রষ্টাকে মান্য করা স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য সবচেয়ে বড় গুনাবলী । যে স্রষ্টার প্রতি অনুগত নয় তার নীতিবোধ থাকে না।
যা পিউর মধ্যে কখনো দেখি না। যাক তোমাকে বলি একটু হালকা হই।
পরের দিন--
আজকে অফিসে ময়না দেরী করে আসছে সাগর তাকে সব সময় বিশ্লেষন করে আর ভাবে তার আর পিউর মধ্যে কি কি তফাৎ।
ময়না কাছে এসে বললো কি ব্যাপার সাগর অন্যমনস্ক কেনো?
ময়না জানো-
জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো
আবার ও নিজেকে নবরূপে নিখুতঁ ভাবে গড়ে তোলার তীব্র ইচ্ছেকে বাস্তব করতে না পারা,
যেখানে ভুল বুঝে তোমাকে ফিরিয়ে দেয়ার মতো বোকামী বিলকুল আর হতো না।
সেই দহনে নিজের ভেতরে যে যন্ত্রনা তা বয়ে বেড়ানোর কষ্টটা কতো ভারী বুঝানো যায় না.....
দেখো সাগর,
জীবন কখনো দূর্বাঘাস
কখনো চাঁদ তারপরও
তোমার আমার একই বৃত্তে বসবাস,
তুমিটা গগনবাসী হাজারো করতালি
আমি শূন্য শ্বশানভুমি তোমাতে নেই আর আমি,
সিড়ির সর্বোচ্চ ধাঁপে তোমার বিচরন
কতো শতো শতো পরিচিত জন।
দুরত্ব বজায় থাকুক ,
থাকুক অপ্রকাশিত কিছু কথা,
অজানা থাকুক কিছু গল্প।
এতো ছন্দ করে কথা বলার অভ্যাস এখনো আছে দেখছি তোমার।
মনে হচ্ছে কবিতা
জ্বী স্যার,
ভেবে দেখুন অতীতের সেই কলেজ ছাত্রী ময়না নই এখন আমি। এখন আপনি এই অফিসের বস, আমি সামান্য কর্মচারী। খোঁচা দিচ্ছো?
না সত্যি টা বললাম স্যার,
স্যার বলো নাতো!
তোমার মুখে সাগর নাম শুনতে কি যে ভালো লাগে,
তাই বুঝি?--
মূলত মানুষ ভুল না করাটা হলো অস্বাভাবিক , ভুল করতে হয়, না হয় আপনি জগতের সব অজানা বিষয় হতে বঞ্চিত থাকবেন। ভুল করে বলেই সংশোধন এতো সুন্দর, ফিরে আসা মানুষ গুলোই পরিশুদ্ধ হয় সবচেয়ে বেশী।
মাঝে মাঝে মনে হয়,
সেই মানুষ গুলো বোধ হয় সবচেয়ে সুখী যারা নিজ নিজ ধর্ম উপাসনালয়ে আজীবন কাটিয়ে দেন। নেই কোন পিছুটান কিংবা সমাজ বেড়াজালের কোন ফরমালেটি একেবারে সাদামাটা বৈরাগী বাউল জীবন.....
হ্যা , তোমার সাহিত্যিক মন আমার মতন,
ময়না বললো--
মানুষটা যেখানে যেই অবস্থায় থাকুক ভালো সুস্থ,সুন্দর , উন্নত থাকুক,আরো সফল হউক এই প্রার্থনা করাই হলো আসল ভালোবাসা। বাকী সব ক্ষনিকের পিপাসা।
সেটা বুঝি ময়না তাই চেস্টা করি পিউকে বুঝাতে ,
শত কৌশল জোর তদবির অভিনয় কিংবা হুমকি মৃত্যু ভয় কোনটাই ভালোবাসার চেয়ে শক্তিশালী নয়।
যা দিয়ে অনায়াসে জয় করা যায় পাথরের মতো কঠিন দূভের্দ্য হৃদয়।
সাগর আগে ভাবীকে নামাজী করো,
নামাজই আত্মশুদ্ধির একমাত্র উপায় লোকের মনের অহংকার ভেদাভেদ দুর করে।
আর ভালোবাসার ক্ষেত্রে
খুব হালকা জিনিসের উপরে ভারী কিছু রাখলে যেমন সব পড়ে নস্ট হয়, তেমনি অতি বাধ্য বাধকতায় মধুরতম সম্পর্ক ও ভেঙ্গে যায়।
সাগর বললো একজন মানুষ সুখী হলে অন্যের তো কোন সমস্যা নেই ,তবুও মানুষ অন্যেকে সুখী দেখলে হিংসায় জ্বলে ,ছোট্ট জীবনে একটু সুখী হতেই সব আয়োজন ।আমাদের একে অন্যেকে সহযোগিতা করা উচিত।ময়না বললো হ্যা সাগর একটা পোষাক যতই দামী হোক যতই ভালোবাসার হোক পুরোনো হলেই সেটাকে নতুনের মতো মনের আনন্দ নিয়ে আর প্রদর্শন করা হয় না, কেনো মানুষ বুঝে না সম্পর্ক পুরনো না হবার জন্যে আমাদের নিজদের মধ্যে ভালোবাসার প্রতিযোগিতা থাকা উচিত।
ভালোথাকা আর ভালোবাসা এক বিষয় নয়, যেখানে প্রত্যাশা আর উচ্চবিলাস মানসিকতা বেশী, ভালোবাসা সেখানে দূর্বল।
সাগর বললো হ্যা একদম তোমার কথা আমি মানি
পিউ আমাদের সংসারের প্রতি ভীষন উদাসীন ।
সব যেনো আমার একার দায়িত্ব।
ওর বড়লোকী কন্যার স্বভাবটা গেলো না।
আমার বাবা মা দেশের বাড়ীতে থাকে মাঝে মাঝে আসে আমার বাসায়,
নিজের বাড়ীতে নিজের মা বাবাকে রাখতে না পারার যন্ত্রনা কি তোমাকে বুঝাতে পারবো না।
আমি লোভে পড়ে পিউকে বিয়ে করি।
তোমাকে কস্ট দিয়ে আজ আমি কি পরিমাণ ভোগ করছি দূর্বিসহ জীবন যাপন করছি বুঝাতে পারবো না, তোমার কাছেই সব বলি।
ময়না বললো সাগর যা হবার হয়ে গেছে মানিয়ে চলো। মানিয়ে চলার নামই জীবন।
সাগর বললো ব্যস্ত থাকা ,বিপরীতে চলা,কস্ট দিয়ে বাক্য বিনিময় অতঃপর দুরত্ব পিউ এর সাথে এমনই সম্পর্ক ।
সূর্য ডুবলে সব অন্ধকার হয় আলোটা নিজেদেরই জ্বালাতে হয়। আমাকে ওর কৃতদাসের মতো ভাবা মানসিকতা ই সব নষ্টের কারণ ,সেইখানে প্রেম শান্তি দুটোই নির্বাসিত ।
ময়না বললো-
সব কিছু তে গুরুত্ব ও মনযোগ থাকতে হয়,ক্ষমতার আধিপত্যে প্রদর্শনে একদিন সব বিগড়ে যায়। অফিস ছুটি হয়েছে অনেকক্ষন
আজ একটু বেশী কথা হয়ে গেলো চলো।
হঠাৎ করে সাগর বললো-
তোমাকে চুমু দেবার অকৃত্রিম বাসনাটা আজো অপূর্ণ রয়েই গেলো , মাঝে মাঝে এতোটাই মাথা চাড়া দিয়ে উঠে ইচ্ছে করে সমস্ত বাধা লজ্জ্বা ভুলে তোমাকে জোর করে কয়েক টা চুমু দেই....
কোন কিছুর জন্য নয় স্বার্থ হীন ভালোবাসায়। আসলে একটা চুমু নিয়ে ও সুখে থাকা যায়, যা আমি অন্য কাউকে কোটি টাকা দিলে ও কখনোই দিতে পারবো না।
সাগর আমরা বন্ধু এসব বলো না।
সাগর :-আমাকে কেনো মাফ করতে পারো না?
ময়না:-না পারি না,ওসব কথা আর বলো না প্লিজ।
একটা সত্য কি জানো,আমার আর আমার স্ত্রী 'পিউর' প্রেমটা ছিলো পরিকল্পিত।
প্রেম পরিকল্পনা মতো করা যায়?
পরিকল্পিত বলছি এই কারণে যে,আমি তার বাবার অর্থ সম্পত্তির প্রেমে পড়েছিলাম আমি লোভী বলেই পিউ আমাকে পুতুলের মতো ব্যবহার করেছে । এই প্রেমের বিয়ের পর বুঝতে পারি সুখের জন্য সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষ প্রয়োজন, যা অন্য্যে কিছু দিয়ে পূরণ সম্ভব হয় না। আজীবন সেই অতৃপ্তি না পাওয়া নিয়ে চোখের জলে ভাসতে হয়।
ময়না বিশ্বাস করো... আমাদের মধ্যে বিলকূল বুঝাপড়া নেই , ইচ্ছে করে মরে যাই প্রতি মূহুর্তে ,আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।
নিজের মতো স্বাধীন বাঁচাটা কতো সুখের, তা শুধুমাত্র তোমার সাথে যেটুকু সময় কথা বলি সেই সময়টাতে বুঝি।
ময়না বললো- মানুষ কবে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে জানো? যখন তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জীবন যাপন করতে করতে হাপিঁয়ে উঠে, বাঁচার রাস্তা খোঁজে ,তখন সে মনের মতো কাউকে পেয়ে গেলেই ভালো মন্দ না ভেবেই জড়িয়ে পড়ে অন্য সম্পর্কে।
চলবে.....